Dhaka 4:40 am, Monday, 5 October 2026
শিরোনাম:
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা লেখা বন্ধের জন্য সাইবার সুরক্ষা আইন হচ্ছে না: তথ্য প্রতিমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে ৫৪ কর্মকর্তাকে হাসপাতাল মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-নেদারল্যান্ডস যৌথভাবে কাজ করবে এলপি গ্যাসের বাজারে অস্থিরতা, একলাফে দাম বাড়ল ২৫২ টাকা যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক প্রকল্পে দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ঢাকার সাবরেজিস্টারদের পদায়নে আসছে লটারি ব্যবস্থা:আইনমন্ত্রী গঠনমূলক সমালোচনা শুনতে সরকার প্রস্তুত: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী ঢাকায় ‘ক্যানবেরা ইউনিভার্সিটি’ ক্যাম্পাস চালুর আহ্বান,অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি আমদানির প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির ফেনী-পরশুরামে ১,৫৪২ কোটি টাকার মুহুরী-কহুয়া প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

আগামী পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী

সময় পোস্ট: বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকার। এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শতাধিক দেশের দুই শতাধিক বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নিচ্ছেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় আস্থা ও নিশ্চয়তা দেবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মাধ্যমে সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা এবং চূড়ান্তভাবে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। এসব স্বাস্থ্যসেবাকর্মী তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যমও হতে হবে। এ লক্ষ্যে আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের চরিত্র গঠনে পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের কথা বলেন তিনি। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে এবং ‘ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর করতে হবে।

কৃষিকে দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।” পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব উদ্যোগ কৃষিখাতকে সহায়তার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুদৃঢ় করা হচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও মিয়ানমারেই হতে হবে। বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। তিনি বলেন, শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালনে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে পাঁচটি মূল বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এগুলো হলো—ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা; বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি; জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা। তিন দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এসব বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

News Update

জনপ্রিয় সংবাদ

গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বা লেখা বন্ধের জন্য সাইবার সুরক্ষা আইন হচ্ছে না: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

আগামী পাঁচ বছরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা: প্রধানমন্ত্রী

Update Time : 10:26:03 am, Saturday, 3 October 2026

সময় পোস্ট: বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পাওয়া নতুন সরকার আগামী পাঁচ বছরে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকার। এখন প্রতিশ্রুতি থেকে সরাসরি বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। শনিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (বিওবিসি) ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শতাধিক দেশের দুই শতাধিক বক্তা, তিন শতাধিক প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী অংশ নিচ্ছেন বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স অ্যান্ড ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন আ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার পাশাপাশি দেশকে শক্তিশালী উৎপাদন ও বিনিয়োগের কেন্দ্রে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয় আস্থা ও নিশ্চয়তা দেবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ অগ্রাধিকার পান। ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এর মাধ্যমে সবচেয়ে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ‘কৃষক কার্ড’ কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা, কৃষিসেবা ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ‘হেলথ কার্ড’-এর মাধ্যমে সবার জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা এবং চূড়ান্তভাবে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর মাধ্যমে নাগরিকদের এক ছাতার নিচে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগে কাজ করছে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। এসব স্বাস্থ্যসেবাকর্মী তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেওয়ার কাজে যুক্ত থাকবেন। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায়ও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের জন্য নয়; শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করার মাধ্যমও হতে হবে। এ লক্ষ্যে আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিশুদের চরিত্র গঠনে পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে। প্রথম শ্রেণি থেকে বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তি দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের কথা বলেন তিনি। দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে জাতীয় অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে দক্ষতা উন্নয়ন ও উপযুক্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপগুলোকে সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে এবং ‘ব্রেইন ড্রেন’কে ‘ব্রেইন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর করতে হবে।

কৃষিকে দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজলভ্য করা হচ্ছে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তার পরিপূরক হিসেবে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্য রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, “একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।” পানি নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি। এসব উদ্যোগ কৃষিখাতকে সহায়তার পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণ, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি স্থাপনে বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানান, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড সার্টিফায়েড ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫৩টিই বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছে। পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব শহর গড়ে তোলার মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, জলবায়ু সহনশীলতা অর্জন এবং দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সুদৃঢ় করা হচ্ছে। মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একই সঙ্গে সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান করতে হবে। যে সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তার সমাপ্তিও মিয়ানমারেই হতে হবে। বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানকে অভিন্ন সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে হলে আরও গভীর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নতুন বাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি তরুণদের জন্য আরও সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। বাংলাদেশ সংলাপ, অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কাজ করে যাবে। তিনি বলেন, শান্তি ও সম্প্রীতিই যৌথ সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের মূল ভিত্তি। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে এমন একটি এলাকায় পরিণত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র একসঙ্গে বিকশিত হবে, পারস্পরিক সুবিধা গ্রহণ করবে এবং নাগরিকরা অর্থবহ সহযোগিতার সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার যথাযথ ভূমিকা পালনে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। সিজিএস আয়োজিত এবারের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনে পাঁচটি মূল বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। এগুলো হলো—ভূরাজনীতি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবারস্পেস ও তথ্যক্ষমতা; বাণিজ্য, সংযোগ ও কৌশলগত প্রবৃদ্ধি; জলবায়ু, সহনশীলতা ও মানব নিরাপত্তা। তিন দিনব্যাপী এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এসব বিষয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে।