সময় পোস্ট: শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে (ইইডি) বদলি-পদায়ন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল ছাড় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহজাহান আলী। বিভিন্ন ঠিকাদার, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি—এমন অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা জানতে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শাহজাহান আলী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বদলি, পদায়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার মতামত কার্যত প্রভাব ফেলত। এমনকি কোনো কর্মকর্তা তার সিদ্ধান্তের বাইরে অবস্থান নিলে বদলি, পদায়ন কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। একাধিক সূত্রের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন আটকে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরিচালন বাজেট ও উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া হতো। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ বিভিন্ন জেলার একাধিক প্রকল্পের ঠিকাদার অভিযোগ করেন, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ পাননি। তাদের দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল, যারা নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটাত। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে হয়রানি ও বঞ্চনার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল ছাড়ের আগে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। বিল অনুমোদন, কাজের পরিমাপ যাচাই এবং অর্থ ছাড়ের বিভিন্ন ধাপে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের দায়িত্ব বণ্টন এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সংযুক্তির ক্ষেত্রেও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে, যার প্রভাব জেলা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
শাহজাহান আলীর সম্পদের উৎস নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, চাকরিজীবনের পাশাপাশি তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে রংপুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং নিজ এলাকায় বিপুল পরিমাণ জমি ও অন্যান্য স্থাবর সম্পদের তথ্য রয়েছে। তবে এসব সম্পদের বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২১ সালে রংপুর অঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে শাহজাহান আলীসহ কয়েকজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়ম ও সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছিল। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ শাখার পরিচালক ওই তদন্ত পরিচালনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় পার হলেও এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তদন্তের ফলাফল এবং অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ফলে এই খাতে টেন্ডার অনিয়ম, বিল বাণিজ্য, প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার কিংবা দুর্নীতির অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও প্রকাশ করে অভিযুক্ত কর্মকর্তার আইনি অধিকার ও সুনাম নিশ্চিত করা উচিত।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহজাহান আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
Reporter Name 











