Dhaka 4:37 am, Thursday, 15 October 2026
শিরোনাম:
সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতির শোক অপরাধ দমনে কঠোর সরকার, ক্লিন হার্টের মতো অভিযান নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের কৌশলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের আস্থা: ড. তিতুমীর জবাবদিহিতা ও সুশাসনে ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে: ডেপুটি স্পিকার নিউইয়র্কে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা, আওয়ামী লীগের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না: তথ্য উপদেষ্টা বাংলাদেশ-ইউএই যৌথ উদ্যোগে কক্সবাজারে সুপেয় পানি প্রকল্পের প্রস্তাব স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সব প্রার্থীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে: প্রতিমন্ত্রী দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও পরিকল্পিত নগরায়ণের তাগিদ রাষ্ট্রপতির নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের আহ্বান রাষ্ট্রপতির আইএমএফের ঋণ ও সংস্কার শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে: অর্থমন্ত্রী

ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের কৌশলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের আস্থা: ড. তিতুমীর

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও দারিদ্র্য কমাতে সরকারের নেওয়া কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। ড. তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় তিনটি বিষয়ে ঐকমত্যের কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় সরকারের কৌশল এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও দারিদ্র্য হ্রাসে নেওয়া কর্মসূচি। তিনি বলেন, ‘আমরা সমস্যাগুলো কার্পেটের নিচে না রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে মোকাবিলা করছি। আমাদের নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং সেই কৌশলের প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি হয়েছে।’ সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান উপদেষ্টা। তাঁর আশা, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দর-কষাকষির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অগ্রগতি হবে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রশংসা পেয়েছে বলেও জানান তিনি। উপদেষ্টার ভাষ্য, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা পরিবার ও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকার সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। করের হার না বাড়িয়ে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে কর প্রশাসনে পৃষ্ঠপোষকতামূলক ব্যবস্থা ও অলিগার্কিক প্রভাবের কারণে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে ছিল। বর্তমান সরকার করব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব নীতিনির্ধারণ ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব পৃথক করার বিষয়ে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সরকার নীতিগতভাবে এ সংস্কারে একমত হয়েছে এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ব্যাংক খাতের অনিয়ম দূর করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠনে সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা তাঁদের অর্থ ফেরত পেতে শুরু করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ড. তিতুমীরের মতে, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো, আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা করছে সরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রেখে আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থের জোগান বাড়াতে নীতিগত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের সংস্কার কর্মসূচি দেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারেই করব্যবস্থা, ব্যাংক খাত, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিয়ে সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, সংস্কারের মালিকানা আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকুক। সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা নিজেরাই এর কৌশল নির্ধারণ করেছি।’ সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশল ও সংস্কার পরিকল্পনায় এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজস্ব পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতের চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির চাপে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব কৌশল এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে। ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এসব আলোচনায় অগ্রগতি হলে সরকারের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

News Update

জনপ্রিয় সংবাদ

সাবেক সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতির শোক

ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের কৌশলে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের আস্থা: ড. তিতুমীর

Update Time : 12:34:12 pm, Wednesday, 14 October 2026

উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা ও দারিদ্র্য কমাতে সরকারের নেওয়া কৌশলের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। ড. তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব আলোচনায় তিনটি বিষয়ে ঐকমত্যের কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ মোকাবিলায় সরকারের কৌশল এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও দারিদ্র্য হ্রাসে নেওয়া কর্মসূচি। তিনি বলেন, ‘আমরা সমস্যাগুলো কার্পেটের নিচে না রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে মোকাবিলা করছি। আমাদের নিজস্ব কৌশল রয়েছে এবং সেই কৌশলের প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরি হয়েছে।’ সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, চীনের এক্সিম ব্যাংক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান উপদেষ্টা। তাঁর আশা, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দর-কষাকষির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়ে অগ্রগতি হবে।

অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন ড. তিতুমীর। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। এ পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রশংসা পেয়েছে বলেও জানান তিনি। উপদেষ্টার ভাষ্য, এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা পরিবার ও কৃষকদের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীল খাতকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়ে নিতে চায় সরকার। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার বিষয়ও জড়িত। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকার সুনির্দিষ্ট কৌশল ও সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। করের হার না বাড়িয়ে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সরকারের সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে কর প্রশাসনে পৃষ্ঠপোষকতামূলক ব্যবস্থা ও অলিগার্কিক প্রভাবের কারণে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে ছিল। বর্তমান সরকার করব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজস্ব নীতিনির্ধারণ ও রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব পৃথক করার বিষয়ে গঠিত কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সরকার নীতিগতভাবে এ সংস্কারে একমত হয়েছে এবং নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তা কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ব্যাংক খাতের অনিয়ম দূর করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণী শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, অতীতে অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠনে সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকেরা তাঁদের অর্থ ফেরত পেতে শুরু করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ড. তিতুমীরের মতে, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানো, আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা অর্থনৈতিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা চালু করা এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো, উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা করছে সরকার। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব কৌশল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রেখে আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে অর্থের জোগান বাড়াতে নীতিগত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের সংস্কার কর্মসূচি দেশের নিজস্ব প্রয়োজন ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগে ঘোষিত ইশতেহারেই করব্যবস্থা, ব্যাংক খাত, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সুশাসন নিয়ে সংস্কারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, সংস্কারের মালিকানা আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকুক। সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী আমরা নিজেরাই এর কৌশল নির্ধারণ করেছি।’ সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশল ও সংস্কার পরিকল্পনায় এ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিজস্ব পরিকল্পনা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতের চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়ন কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি। এসব সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির চাপে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে উল্লেখ করেন ড. তিতুমীর। তাঁর মতে, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সংকট এবং সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব কৌশল এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে। ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এসব আলোচনায় অগ্রগতি হলে সরকারের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন আরও গতিশীল হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।