নিজস্ব প্রতিবেদক: স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (SUB) ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ স্টাডিজ (DES)-এর ৫৫তম ব্যাচের ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে একাডেমিক স্বচ্ছতা, তথ্য উপস্থাপনের যথার্থতা এবং প্রশাসনিক তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, একজন গার্ডিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এমন কিছু অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে এসেছে, যার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেসবুক পোস্টে কী বলা হয়েছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ৮ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত এক পোস্টে জানানো হয়, গত ৬ জুলাই ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ স্টাডিজের ৫৬তম ব্যাচ ৫৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সম্মানে “A Heartfelt Farewell of Batch 55, DES” শীর্ষক একটি বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ওই পোস্টে ৫৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের “Graduating Students” হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পোস্টে আরও বলা হয়, অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতার হোসেন খান, ডিন অধ্যাপক ড. কে. এম. আনোয়ারুল ইসলামসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন এবং ৫৫তম ব্যাচের শিক্ষা জীবনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শুভকামনা জানানো হয়।
অভিযোগ: কোর্স সম্পন্নের আগেই ‘Graduating Students’?
অনুসন্ধানে কথা বলা কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীর দাবি, ৫৫তম ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থীর তখনও সব কোর্স, পরীক্ষা বা অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। তাদের প্রশ্ন, এমন পরিস্থিতিতে পুরো ব্যাচকে “Graduating Students” হিসেবে উল্লেখ করার ভিত্তি কী ছিল। অভিযোগকারীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক প্রকাশনায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের একাডেমিক গুরুত্ব রয়েছে। তাই কোনো ব্যাচকে “Graduating Students” হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Graduating Student’ পরিচয়:
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পোস্ট প্রকাশের পর কয়েকজন শিক্ষার্থী নিজেদের ব্যক্তিগত ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেয়ারওয়েল অনুষ্ঠানের ছবি, ভিডিও ও শুভেচ্ছা বার্তা প্রকাশ করেন। এসব পোস্টে কেউ কেউ নিজেদের “Graduating Student” বা গ্র্যাজুয়েটিং ব্যাচের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন। অভিযোগকারীদের মতে, যদি সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কারও একাডেমিক কার্যক্রম তখনও অসম্পূর্ণ থেকে থাকে, তাহলে এ ধরনের উপস্থাপনা পরিবার, সমাজ, সম্ভাব্য নিয়োগদাতা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই প্রতিবেদনের হাতে এমন কোনো তথ্য নেই, যা থেকে বলা যায় যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রচার করেছেন। তাদের অনলাইন উপস্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রভাবেও হয়ে থাকতে পারে।
এক শিক্ষার্থীর গার্ডিয়ানের অভিযোগ:
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ৫৫তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থীর গার্ডিয়ান অভিযোগ করেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন শারীরিক অসুস্থ থাকার কারণে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারেননি। ফলে কয়েকটি সেমিস্টারের টিউশন ফিও সময়মতো পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। গার্ডিয়ানের দাবি, পরবর্তীতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সেমিস্টার ফি মওকুফের আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। বরং তাকে জানানো হয়, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পুনরায় রেজিস্ট্রেশনসহ প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করতে হবে। তিনি বলেন, “আমরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীর একাডেমিক কার্যক্রম শেষ হোক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। কিন্তু যদি একজন শিক্ষার্থীকে সব নিয়ম মেনে নতুন করে একাডেমিক প্রক্রিয়ায় ফিরতে বলা হয়, তাহলে একই ব্যাচের কিছু শিক্ষার্থীকে কোর্স সম্পন্ন হওয়ার আগেই ‘Graduating Students’ হিসেবে ফেয়ারওয়েল দেওয়া হলো কীভাবে—এই প্রশ্নের উত্তর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া উচিত।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো শিক্ষক বা কোনো বিশেষ মহলের কাছ থেকে আলাদা সুবিধা চাই না। সবার জন্য একই একাডেমিক নীতিমালা কার্যকর হোক।” তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাইয়ের আহ্বান জানান।
শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন:
অনুসন্ধানে কথা বলা কয়েকজন শিক্ষার্থী বিভাগের কিছু একাডেমিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, কিছু শিক্ষার্থী একাডেমিক ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণভাবে পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে এই প্রতিবেদনের হাতে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ আসেনি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের বনভোজন নিয়েও অভিযোগ:
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালে বিভাগের বনভোজন আয়োজন নিয়েও কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের দাবি, কিছু শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা আর্থিক কারণে শ্রীমঙ্গলে আয়োজিত বনভোজনে অংশ নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও অংশগ্রহণের জন্য চাপ অনুভব করেছিলেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনিক কর্মকর্তার বক্তব্য
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, “চার-পাঁচজন শিক্ষার্থীর জন্য তো আর ফেয়ারওয়েল বন্ধ করে রাখা ঠিক হবে না। আপনারা তো জানেন, এ ধরনের অনুষ্ঠানে অনেক খরচ হয়।” তিনি আরও বলেন,“যদি কেউ এতে কষ্ট পেয়ে থাকেন বা কোনো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকে, সেটি অবশ্যই দুঃখজনক।” তবে “Graduating Students” শব্দ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
দায় কার, তদারকি কোথায়?
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক তথ্য প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অবস্থান নির্ধারণ এবং আনুষ্ঠানিক আয়োজনের ক্ষেত্রে বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে অনুষদ, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর, রেজিস্ট্রার কার্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমন্বিত দায়িত্ব থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ব্যাচকে “Graduating Students” হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের কোর্স সম্পন্ন, ফলাফল, ক্রেডিট অর্জন এবং অন্যান্য একাডেমিক শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। যদি সেই যাচাই-বাছাইয়ে কোনো ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে তা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দুর্বলতা নাকি তথ্য উপস্থাপনের ত্রুটি—সেটি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য ও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত একাডেমিক অবস্থার মধ্যে অসামঞ্জস্যের অভিযোগ উঠলে তা শুধু একটি বিভাগের বিষয় নয়; বরং এটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক সুশাসন, জবাবদিহি ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও উত্থাপন করে। তাদের মতে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের একাডেমিক রেকর্ড, পরীক্ষার ফলাফল, বিভাগীয় সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে। অভিযোগের প্রকৃতি ও গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পারে।
ইউজিসির ভূমিকা:
বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক কার্যক্রমের সামগ্রিক তদারকির দায়িত্ব বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি)। উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম বা আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত বিষয়টি ব্যাখ্যা করা। অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে ইউজিসিও বিষয়টি পর্যালোচনা করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্যের অপেক্ষা:
এ বিষয়ে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ স্টাডিজের চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Reporter Name 













